প্রিন্ট এর তারিখ : ২৯ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুলাই ২০২৬
বেতাগীর আনোয়ারা বেগম স্কুলে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে আ.লীগ নেতাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বভার
এম. মতিন, চট্টগ্রাম ব্যুরো ||
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় কর্যক্রম নিষিদ্ধ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন সহসভাপতির পদধারী নেতা আবু জাফর মাস্টারকে বেতাগীর কাউখালি আনোয়ারা বেগম উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের ও ভুল তথ্য উপস্থাপন অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও ভারপ্রাপ্ত ওই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা ও এক শিক্ষকের কাছ থেকে পদত্যাগ করেছেন মর্মে জোরপূর্বক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়ার অভিযোগে চট্টগ্রাম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেছেন (মামলা নং ৫৩৬/২০২৫) স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মাস্টার আবুল হোসেন। সে মামলায় ৪২০/৩৮৬ ধারায় অপরাধ প্রমানিত হওয়ায় আদালতে আত্মসমর্পণও করেন আবু জাফর মাস্টার। এ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দ্বায়িত্বভার নিয়ে স্কুলের শিক্ষক কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে।জানা যায়, রাঙ্গুনিয়া উপজেলার কাউখালি আনোয়ারা বেগম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আইয়ুব মাস্টার চলতি বছর ১১ মার্চ অবসর গ্রহণ করেছেন। সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য হলে কিংবা প্রধান শিক্ষক কোনও কারণে অনুপস্থিত থাকলে প্রতিষ্ঠানের সহকারী প্রধান শিক্ষক দায়িত্ব পালন করবেন। এক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে তার দায়িত্বভার পালন সম্পর্কিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরকারি পরিপত্রে (স্মারক নং: শিম/শা:১১/৩-৯/২০১১/২৫৬) বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক থাকা অবস্থায় তাকে ছাড়া অপর কোনও শিক্ষককে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বভার অর্পণ করা যাবে না।পরিপত্রে আরও বলা হয়েছে, কোনও বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক না থাকলে জ্যেষ্ঠতম সহকারী শিক্ষক প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বভার পালন করবেন। অথচ জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মুছা কালিমিল্লাহ থাকার পরও ম্যানেজিং কমিটি সরকারি পরিপত্রের তোয়াক্কা না করে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় কনিষ্ঠ সহকারী শিক্ষক আবু জাফর মাস্টারকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। এনিয়ে জ্যেষ্ঠতম শিক্ষক মুছা কলিমুল্লাহ প্রথমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। প্রতিকার না পেয়ে পরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে অভিযোগ করেন। এখানে একজন প্রভাবশালী দাতাকে নিয়েও রয়েছে গুরুতর জালিয়াতির অভিযোগ। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, পূর্বেকার সভাপতি পরিচালনা কমিটির কোন সভা বিদ্যালয় অঙ্গণে অনুষ্ঠিত না হওয়ারও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক জানান, উক্ত দাতা বিদ্যালয়ের পাশ্ববর্তী ভূমিহীন কৃষকের রেজিষ্ট্রেশন প্রদানে অযোগ্য জায়গা জোরপূর্বক দখল করে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দীর্ঘকাল পর অর্থাৎ ২০১৩ সালে দাতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। যদিও শিক্ষা বোর্ডের প্রবিধান অনুসারে প্রতিষ্ঠার পর কিংবা অন্যের জমি দখল করে এ ধরনের দাতা হওয়ার সুযোগ নেই। তাছাড়া এটা নিয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি অভিযোগের তদন্ত চলমান রয়েছে। স্থানীয় ব্যক্তি না হওয়া সত্ত্বেও সরকারের সর্বশেষ পরিপত্রের নির্দেশনা উপেক্ষা করে চাপের মুখে উক্ত বিতর্কিত দাতাকে এডহক কমিটির সভাপতি মনোনয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।এদিকে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক সংকট প্রবল হওয়ায় দুইজন চতুর্থ শ্রেণীর অফিস সহায়ক কর্মচারীকে রুটিনের অন্তর্ভূক্ত করে দৈনন্দিন পাঠদান করানো হয় বলে জানা গেছে। এবং বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর ধরে বিদ্যালয়টিতে শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের কোন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। সাংস্কৃতিক চর্চায় নির্দেশনা দিতে সক্ষম কোন শিক্ষক নেই। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, সহ-শিক্ষা ক্রমিক কার্যাবলী ও চুড়ান্ত পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে উপজেলার মধ্যে বিদ্যালয়টির সার্বিক মান একেবারে নিচের দিকে।অন্যদিকে বিদ্যালয়টির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক মামলা বিচারধীন রয়েছে। জালিয়াতি সংক্রান্ত বিষয়ে এক শিক্ষকের দায়ের করা মামলায় সদ্যবিদায়ী প্রধান শিক্ষক আইয়ুব মাস্টারকে চাকরিরত অবস্থায় জেল-হাজতে যেতে হয়েছে। উক্ত মামলায় বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু জাফর ও অন্য এক শিক্ষক জামিনে আছেন। এসব বিষয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে চাপা উদ্বেগ বিরাজ করলেও বর্তমান কিংবা পূর্বেকার কমিটির সদস্যদের কোন তৎপরতা দেখা যায়না। এবিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোনো শিক্ষক সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক দলের পদে থাকতে পারেন না। অথচ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু জাফর মাস্টার শিক্ষকতার পাশাপাশি বেতাগী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতম শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি।তাঁরা আরও জানান, জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়টি গোপন রেখে এ দায়িত্বভার দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসনিক অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েও শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।শিক্ষার এমন নিম্নমানে কয়েকজন সচেতন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'একটি অশুভ শক্তিশালী প্রভাব বলয় থেকে মুক্ত না হওয়ায় বিদ্যালয়টি দিন দিন আলোর পরিবর্তে অন্ধকার ছড়াচ্ছে।'তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু জাফর মাস্টার বলেন, 'আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। সহকারী প্রধান শিক্ষক না থাকায় কর্তৃপক্ষ ও ম্যানেজিং কমিটি বিধি অনুযায়ী দুইবার রেজুলেশন করে আমাক দায়িত্ব দিয়েছে। আওয়ামী লীগ রাজনীতির সাথে যুক্ত কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত নন দাবি করে বলেন, আসলেতো বুজতে পারছেন, এলাকায় থাকলে তো একটুআধটু...। তবে স্কুল ফেলে কোথাও গিয়ে মিছিল মিটিং করিনি। হয়তো দুইএকটাতে গিয়েছি। কমিটির শীর্ষ পদে নাম থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, কেউ দিয়েছে বিধায় হয়তো নাম থাকতে পারে, কিন্তু আমিতো ওঁৎপোতভাবে জড়িত নাহ্। হয়তো কোন সময় স্কুল বন্ধ থাকলে ওই বন্ধের সময়ে আওয়ামী লীগের প্রোগ্রামে গিয়েছি এতটুকু, ধন্যবাদ।
সম্পাদক ও প্রকাশক
ফোরকান মাহমুদ
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
মাইকেল দাশ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত প্রতিদিনের চট্টগ্রাম